সম্প্রীতির দুর্গ: রাঙামাটির আইন-শৃঙ্খলা সভায় শান্তির বার্তা
ছবি: আবাসন নিউজ২৪.কম
মো: কামরুল ইসলাম
রাংগামাটি জেলা প্রতিনিধি:
নানা জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মাবলম্বীর সহাবস্থানে পরিচিত পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র রাঙামাটি। এখানকার সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্য হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, যা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় আরও একবার জোরালোভাবে উঠে এসেছে। জেলার সার্বিক নিরাপত্তা ও আসন্ন বৃহৎ ধর্মীয় উৎসবগুলো শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে আয়োজিত এই সভায় উপস্থিত জেলার শীর্ষ রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা একযোগে শপথ নিয়েছেন—কোনো অপচেষ্টাকেই বরদাস্ত করা হবে না, সম্প্রীতির বন্ধনকে অক্ষুণ্ণ রাখা হবে যেকোনো মূল্যে।
উৎসবের আগে শান্তির বার্তা রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মো: হাবিব উল্লাহ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল কারণ সামনেই রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মহৎ কঠিন চীবর দান উৎসব। এছাড়াও, সভায় সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী খাগড়াছড়িতে ঘটে যাওয়া কয়েকটি স্পর্শকাতর ঘটনাবলি নিয়েও বিশদ আলোচনা হয়।
সভায় উপস্থিত সকলে একবাক্যে স্বীকার করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সবসময়ই সম্প্রীতির আবাসভূমি। বিভিন্ন সময় কিছু স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়িয়ে বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে এখানকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করে। বক্তারা দৃঢ়তার সাথে বলেন, এ ধরনের অপচেষ্টা যারা চালায়, তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা।
ঐক্যের ডাক, গুজব প্রতিহতের অঙ্গীকার
এই অপশক্তির মোকাবেলা করতে হলে শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, এই প্রতিরোধ হতে হবে সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড বা বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না এমন কঠোর বার্তা দেওয়া হয় সভা থেকে। কেউ যদি এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির দুঃসাহস দেখায়, তবে সম্মিলিতভাবে তা প্রতিহত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন উপস্থিত সকলে।
সভায় জেলা প্রশাসক মো: হাবিব উল্লাহ বলেন, রাঙামাটি সবসময় শান্তি ও সম্প্রীতির জেলা হিসেবে পরিচিত। আমরা চাই আগামী দিনগুলোতেও সব সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদযাপন করবেন।" তিনি জানান, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
তবে জেলা প্রশাসক আরও উল্লেখ করেন, "তবে শুধু প্রশাসন নয়, সাধারণ মানুষের সহযোগিতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে হলে কেবল প্রশাসনিক কড়াকড়ি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সচেতনতা।
এই সভা শুধু একটি আইন-শৃঙ্খলা বৈঠক ছিল না, এটি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুধা-বৈচিত্র্যের মাঝে বিদ্যমান গভীর সংহতি ও বন্ধনের প্রতিচ্ছবি। যেখানে ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক অভিন্ন লক্ষ্যের জন্য একত্রিত হন আর তা হলো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা। দুর্গাপূজা এবং কঠিন চীবর দান উৎসবের মতো বৃহত্তর আয়োজনের আগে এই ঐকমত্যের ঘোষণা রাঙামাটির মানুষের মাঝে এক নতুন আস্থার জন্ম দেবে। রাঙামাটিবাসী প্রত্যাশা করে, এই সংহতি ও সতর্কতা বজায় রেখে তারা আবারো প্রমাণ করবে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সত্যিই সম্প্রীতির দুর্গ।