শনিবার, ২৯শে মার্চ, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

ঝালকাঠিতে রাতভর ডাকাত আতংকের গুজবে গণপিটুনি খেলেন নয় নির্মান শ্রমিক

আবাসন নিউজ ২৪ ঝালকাঠি প্রতিনিধি

ঝালকাঠিতে রাতভর ডাকাত আতংকের গুজবে গণপিটুনি খেলেন নয় নির্মান শ্রমিক

সোমবার রাত দশটার পরবর্তী কিছু সময়। হঠাৎ ঝালকাঠির পৌর শহর ও আশের এলাকায় ডাকাত আতংক।মসজিদে মসজিদে মাইকিং,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সতর্ক বার্তা। পরবর্তীতে মসজিদের মাইকে ডাকাত পড়ার ঘোষণা শুনে লাঠিসোঁটা, দা, বঁটিসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে এলাকাবাসী। গতকাল সোমবার রাতে ঝালকাঠি সদর উপজেলার পিপলিতা গ্রামের বাকলাই বাড়ির সামনে ডাকাত সন্দেহে উত্তেজিত জনতা নয়জনকে পিটিয়ে আহত করে। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে পাঠায়। যদিও আহতদের দাবি তারা ডাকাত নয় নির্মান শ্রমিক।এ সময় একটি ট্রলার হেফাজতে নেয় পুলিশ, যেটিতে রাস্তা ও ব্রিজ নির্মাণকাজের যন্ত্রাংশ ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায় , গতকাল সোমবার রাতে এলাকায় ডাকাত আতঙ্কে মসজিদে মাইকিং চলছিল। তখন স্থানীয় আইনজীবী বনি আমিন বাকলাই অনেককে মোবাইল ফোনে জানান, ডাকাতের দল তাঁর বাড়ির আশপাশে ঘোরাফেরা করছে, তাঁদের মুখ বাঁধা। এর পরপরই স্থানীয়রা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালায়।
এ বিষয়ে এডভোকেট বনি আমিন বাকলাই বলেন, ‘সোমবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে বেশ কয়েকজন লোক আমার বাড়ির কাছে ট্রলার থামিয়ে ওঠে। তারা বাড়ির চারপাশে ঘোরাফেরা করতে থাকে, যা আমি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করি। একই সময়ে নদীর অপর পাড়ে ডাকাতি হচ্ছে এমন মাইকিং হতে থাকে। তাদের সন্দেহজনক ঘোরাফেরা দেখে আমি সদর থানার ওসি ও কয়েকজন স্থানীয়কে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানাই। এরপর কয়েক শতাধিক লোক এসে তাদের আটক করে। আমি তাদের পুলিশে হস্তান্তর করি।’
বনি আমিন বাকলাই আরও বলেন, ‘এক ঘণ্টা পর ঝালকাঠির ব্যবসায়ী ফাইজুল ইসলাম এসে জানান যে, তাঁরা তাঁর নির্মাণশ্রমিক। তাঁদের ডাকাত সন্দেহে আটক করার কারণে তিনি এলাকাবাসীকে গালাগালও করেন। তখন বিক্ষুব্ধ জনতা তাঁকে মারধর করে। আমি তাঁকে উদ্ধার করে নিরাপদে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
ডাকাত সন্দেহে নির্মাণশ্রমিকদের মারধরের বিষয়ে ঝালকাঠি কামারপট্টি এলাকার ফারিয়া ইলেকট্রনিকসের স্বত্বাধিকারী ও ঠিকাদার মো. ফাইজুল ইসলাম বলেন, ‘পিরোজপুরে আমার ৯ কোটি টাকার কালভার্ট ও রাস্তার কাজ চলছিল। ৩ কোটি টাকার কাজ শেষ হলেও বিল না পাওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আমি ট্রলারযোগে নির্মাণকাজের মালামাল ঝালকাঠির দিকে নিয়ে আসি। ট্রলারটি বনি আমিন বাকলাইয়ের বাড়ির কাছে নোঙর করে। তাদের বলি মালামাল ট্রাকযোগে আমার বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য। কিছুক্ষণ পর আমার শ্রমিকেরা জানায়, এলাকাবাসী মাইকিং করে তাদের ডাকাত সন্দেহে আটকে রেখেছে। খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে বলি, তারা আমার লোক। তখন আমার ওপর হামলা চালানো হয়। জীবন বাঁচাতে আমি দ্রুত সেখান থেকে চলে আসি।’
ফাইজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আমার শ্রমিকদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। তারা কোনোভাবেই ডাকাত নয়। তাদের সঙ্গে থাকা ট্রলারটিতে নির্মাণকাজের যন্ত্রাংশ ছিল। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নির্দোষ ব্যক্তিদের ওপর হামলা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বলেন, ‘বনি আমিন বাকলাই এলাকায় ডাকাতির গুজব রটান। এরপর স্থানীয়রা আট-নয়জনকে মারধর করে। পুলিশ যদি সময়মতো না পৌঁছাত, গণপিটুনিতে সবাই মারা যেতে পারত। গুজব রটানো এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের ওপর হামলা করার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নইলে মব জাস্টিস থামবে না।’
এ বিষয়ে ঝালকাঠি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ডাকাত সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে আটকের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে তাঁদের চিকিৎসার জন্য ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’